২০১০ সালের ২৫ আগস্ট জনতা ব্যাংক থেকে ৮০ কোটি টাকা ঋণ নেয় গ্যালাক্সি সোয়েটার অ্যান্ড ইয়ার্ন ডায়িং লিমিটেড। ২০১৫ সাল শেষে প্রতিষ্ঠানটির ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬৫৯ কোটি টাকায়। গত বুধবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের দেয়া দেশের শীর্ষ ১০০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় ৭৫ নম্বরে রয়েছে গ্যালাক্সি সোয়েটার অ্যান্ড ইয়ার্ন ডায়িং লিমিটেড। এননটেক্স গ্রুপের অন্যতম প্রতিষ্ঠান এটি, যার কর্ণধার ইউনুস বাদল।

আরো পড়ুন

Error: No articles to display

গ্যালাক্সি সোয়েটারের ঋণের মতোই বিস্ময়কর উত্থান এননটেক্সের কর্ণধার ইউনুস বাদলের। পুরো প্রক্রিয়াটিতে সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে জনতা ব্যাংক। ২০১০ সাল থেকে পরবর্তী পাঁচ বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটি থেকে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ বের করে নিয়েছেন তিনি। মাছের তেলে মাছ ভাজার মতোই ব্যাপার। এজন্য বের করা হয়েছে তেল আহরণের নিত্যনতুন উৎস। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটি থেকে নেয়া ঋণের অর্থে গড়ে তোলা হয়েছে ২২টি কোম্পানি। এরপর একেকটি কোম্পানির নামে নেয়া ঋণের অর্থে পরিশোধ করা হয়েছে অন্য প্রতিষ্ঠানের ঋণ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১০ সালের পর পাঁচ বছরে জনতা ব্যাংক থেকে উদারহস্তে ঋণ পেয়েছেন ইউনুস বাদল। ঋণের টাকায় নতুন প্রতিষ্ঠান যেমন গড়েছেন, ঠিক তেমনি অন্য ঋণের সুদ পরিশোধ করেছেন। কিন্তু দুই বছর ধরে জনতা ব্যাংক থেকে তার ঋণ পাওয়ার পথ কিছুটা রুদ্ধ হয়েছে। এতেই বন্ধ হয়ে গেছে ইউনুস বাদলের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন। ঋণের সুদ পরিশোধ করতে না পারায় এননটেক্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো খেলাপির খাতায় নাম লেখাতে শুরু করেছে।
তবে জনতা ব্যাংকের রুদ্ধ দুয়ার আবারো খোলার তদবির চালাচ্ছেন ইউনুস বাদল। ব্যাংকটি থেকে নতুন ঋণ নিতে এরই মধ্যে অর্থমন্ত্রীর কাছে ধরনা দিয়েছেন। অর্থমন্ত্রীও জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান-এমডিকে নিয়ে বৈঠক করে নতুন ঋণ দেয়ার প্রক্রিয়া আলোচনা করেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর ইউনুস বাদলকে আরো ঋণ দিতে তত্পর হয়েছে জনতা ব্যাংক। সম্প্রতি জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তারা এননটেক্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শক দল ইউনুস বাদলকে নতুন ঋণ দেয়ার বিষয়ে পরিচালনা পর্ষদে ইতিবাচক প্রতিবেদন জমা দিয়েছে বলে জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আব্দুছ ছালাম আজাদ বলেন, জাতীয় সংসদে ঘোষিত শীর্ষ ১০০ ঋণখেলাপির তালিকায় এননটেক্স গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে। আমাদের হিসাবে এননটেক্সের যে প্রতিষ্ঠানটি খেলাপি, সেটির নাম তালিকায় আসেনি। কেন এমনটি হলো এখনো জানতে পারিনি। গ্যালাক্সি সোয়েটার অ্যান্ড ইয়ার্ন ডায়িং লিমিটেডের নাম শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকায় এসেছে।
তিনি বলেন, অনেক দিন থেকেই এননটেক্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ হিসেবে কোনো চলতি মূলধন পাচ্ছে না। এজন্য তাদের কিছু প্রতিষ্ঠান বিপাকে আছে। গ্রুপটির ঋণের বিষয়ে জনতা ব্যাংকের সব পর্ষদ সভায় আলোচনা হচ্ছে। এননটেক্সের প্রতিষ্ঠানগুলো সচল রেখে ঋণ আদায়ের জন্য তত্ত্বাবধান বাড়ানো হয়েছে। আমরা এখনো আশাবাদী।
ইউনুস বাদলকে নতুন ঋণ দেয়ার বিষয়ে মো. আব্দুছ ছালাম আজাদ বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলো সচল রাখতে নতুন ঋণ চাইছে এননটেক্স গ্রুপ। বিষয়টি নিয়ে আলাপ-আলোচনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। অর্থমন্ত্রীর আহ্বানে একটি বৈঠক হয়েছে। দেখা যাক কী হয়।
সূত্র জানায়, জুভেনিল সোয়েটার নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যবসায় নামেন ইউনুস বাদল। ২০০৪ সালে জনতা ব্যাংকের শান্তিনগর শাখায় গ্রাহক হওয়ার মাধ্যমে কোম্পানিটি ব্যাংকিং সুবিধা নেয়া শুরু করে। ওই শাখার বেশি ঋণ দেয়ার ক্ষমতা না থাকায় ২০০৮ সালে জনতা ভবন করপোরেট শাখায় ঋণটি স্থানান্তর করা হয়। তখন পর্যন্ত ইউনুস বাদলের যাত্রা ছিল খুবই সীমিত পরিসরে। ২০১০ সালে এসে ভাগ্যের দুয়ার খুলে যায় তার। সে বছরের ২৫ আগস্ট গ্যালাক্সি সোয়েটার অ্যান্ড ইয়ার্ন ডায়িং লিমিটেডের নামে ৮০ কোটি টাকা ঋণ পান তিনি। এরপর শুধুই বাড়তে থাকে তার ঋণের পরিমাণ ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। ঋণের অর্থ উপযুক্ত খাতে ব্যয় না করে অন্যত্র স্থানান্তরের অভিযোগও আছে ইউনুস বাদলের বিরুদ্ধে।
ইউনুছ বাদলের এননটেক্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে গ্যালাক্সি সোয়েটার অ্যান্ড ইয়ার্ন ডায়িং, জ্যাকার্ড নিট টেক্স, সুপ্রভ মিলাঞ্জ স্পিনিং, সুপ্রভ কম্পোজিট, সুপ্রভ রোটর স্পিনিং, জারা নিট টেক্স, জারা ডেনিম, জারা লেবেল অ্যান্ড প্যাকেজিং, এফকে নিট, লামিসা স্পিনিং, ইয়ার্ন ডায়িং, জুভেনিল সোয়েটার, সিমি নিট টেক্স, সিমরান কম্পোজিট, গ্যাট নিট টেক্স, জেওয়াইবি নিট টেক্স, এমএইচ গোল্ডেন জুট, স্ট্রাইগার কম্পোজিট, আলভি নিট টেক্স, এম নূর সোয়েটার্স, শাইনিং নিট টেক্স ইত্যাদি। গ্রুপটির চেয়ারম্যান করা হয়েছে বাদলের ভাই ইউসুফ বাবুলকে, যিনি স্থায়ীভাবে কানাডায় বসবাস করছেন।
জানা গেছে, ২০১০ সালে ৮০ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার পরের বছরই জনতা ব্যাংক থেকে ৫৭১ কোটি টাকা বের করেছেন ইউনুস বাদল। এরপর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটি থেকে ২০১২ সালে ৮১৬ কোটি, ২০১৩ সালে ১ হাজার ১৯৯ কোটি, ২০১৪ সালে ৫৬০ কোটি ও ২০১৫ সালে ৩০০ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছেন তিনি। ইউনুস বাদলের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ২০১১ সালে সিমি নিট টেক্সকে ৯৫ কোটি, সুপ্রভ কম্পোজিটকে ৩৮০ কোটি এবং এফকে নিটের নামে ৯৬ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন করে জনতা ব্যাংক পর্ষদ। পরের বছর সিমরান কম্পোজিটকে ৪৫০ কোটি, জারা নিট টেক্সকে ৯৬ কোটি, গ্যাট নিট টেক্সকে ৯৬ কোটি এবং জেওয়াইবি নিট টেক্সকে ৯৩ কোটি টাকার ঋণ দেয়া হয়। ২০১২-১৩ সাল পর্যন্ত এমএইচ গোল্ডেন জুটকে দেয়া হয় ১৫১ কোটি টাকা। ২০১৩ সালে লামিসা স্পিনিংকে ১৩৪ কোটি, জ্যাকার্ড নিট টেক্সকে ৩২০ কোটি, স্ট্রাইগার কম্পোজিটকে ৯০ কোটি, আলভি নিট টেক্সকে ৯৬ কোটি, এম নূর সোয়েটার্সকে ৬০ কোটি ও সুপ্রভ স্পিনিংকে ৪৩০ কোটি টাকা দেয়া হয়। ২০১৪ সালে আবার জারা লেবেল অ্যান্ড প্যাকেজিংকে ৫৩ কোটি, সুপ্রভ মিলাঞ্জ স্পিনিংকে ১৫৫ কোটি, শাইনিং নিট টেক্সকে ৮৮ কোটি ও জারা ডেনিমকে দেয়া হয় ৫৫ কোটি টাকা। আর ২০১৫ সালে সুপ্রভ রোটর স্পিনিংকে দেয়া হয় ৩০০ কোটি টাকা।
শীর্ষ ঋণখেলাপিদের তালিকায় স্থান পাওয়ার বিষয়ে জানতে গতকাল মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় এননটেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ইউনুস বাদলের সঙ্গে। কিন্তু একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। খুদে বার্তা পাঠিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলেও তিনি সাড়া দেননি।
তবে ব্যাংক-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতদিন ইউনুস বাদল ব্যাংকের নতুন ঋণের টাকায় পুরনো ঋণের সুদ পরিশোধ করেছেন। এ কারণে তার প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ খেলাপি হয়নি। যদিও এর আগে ২০১৫ সালে ইউনুস বাদলকে ১ হাজার ৯৭ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠন করার সুযোগ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ইউনুস বাদলের প্রতিষ্ঠানগুলোর কয়েকটিতে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠানের অবস্থা খুবই নাজুক। সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারির মতো এননটেক্সও একই ভাগ্য বরণ করতে যাচ্ছে বলে তারা মনে করেন। সূত্র:বনিক বার্তা

আরো পড়ুন

Error: No articles to display