কিংবদন্তী গায়িকা নূরজাহানের দুর্ব্যবহারের একটি কুখ্যাত ঘটনার লক্ষ্যবস্তু ছিলেন রুনা লায়লা : মিলি

বাংলা সঙ্গীতাঙ্গনের কিংবদন্তী কষ্ঠশিল্পী রুনা লায়লা। অসংখ্য জনপ্রিয় গান উপহার দিয়ে দর্শকদের মনের মণি কোঠায় স্থান করেছেন নিয়েছেন। নিজের কাজের কৃতিত্বের জন্য পেয়েছেন অসংখ্য পরুস্কার। তবে ক্যারিয়ার জীবনে বিভিন্ন সময়ে মুখোমুুখী হয়েছেন কঠিন বাস্তবতার সামনে। আজকের এই অবস্থানের জন্য অনেক অপমানের শিকার হতে হয়েছে তাকে।বিষয় নিয়ে সা/মাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ/কটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন লে/খিকা মিলি সুলতানা হু/বহু পাঠকদের জন্য নি/চে দেওয়া হলো।

নিসার বাজমি পাকিস্তানের একজন দক্ষ সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি আলমগীর ও মেহনাজ বেগমের মতো নতুন গায়কদেরও পরিচয় করিয়ে দেন দর্শকদের সাথে। ভারতীয় সুরকার যুগল লক্ষ্মীকান্ত-পেয়ারেলাল ভারত ভাগের আগে নিসার বাজমির সাথে কাজ করেছিলেন। সেই নিসার বাজমি একদিন টিভি সাক্ষাতকারে রুনা লায়লার প্রশংসা করেছিলেন। এ ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন নূরজাহান। নিসার বাজমিকে সতর্ক বার্তা পাঠান, বাজমিকে গণমাধ্যমে তার বক্তব্যের সংশোধনী দিতে হবে। অর্থাৎ বলতে হবে, তিনি নূরজাহানের নাম উল্লেখ না করে ভুল করেছেন। রুনা লায়লার নাম প্রত্যাহার করতে হবে। কিন্তু নিসার বাজমি নূরজাহানের সাথে তীব্র দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, “রুনা তরুণ উদীয়মান কণ্ঠস্বর। তার প্রশংসা না করলে অন্যায় হবে।” এটা তার জন্য কাল হয়। পাকিস্তানের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে তখন নূরজাহানের প্রচণ্ড দাপট। ইয়াহিয়া খানের গার্লফ্রেন্ড ছিলেন বলে খবরদারি খুব বেশি চালাতেন। নূরজাহানের অত্যাচারে নিসার বাজমিকে করাচি ছেড়ে লাহোরে চলে যেতে হয়েছিল। যদিও শেষের দিকে নূরজাহান তার ভুল বুঝতে পেরে বাজমির কাছে মাফ চেয়েছিলেন।কিন্তু বাজমি নূরজাহানকে ক্ষমা করতে পারেননি।

উর্দু ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে দুই শিবির ছিল। এক শিবির নূরজাহানের তোষামোদী করে তাকে সন্তুষ্ট করে কাজ বাগিয়ে নিতো। আরেক শিবির তার বিরুদ্ধে ছিল। যারা বিরুদ্ধে ছিল তাদেরকে বিদায় নিতে হয়েছে ইন্ডাস্ট্রি থেকে। যারা তার পা ধরে থাকতো, তাদের জন্য তিনি সুপারিশ করতেন। চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ করে দিতেন। কথায় কথায় কনট্রোভার্সিতে জড়িয়ে পড়তেন। তিনি নিসার বাজমি,মুসাররাত নাজির, নাহিদ আখতার, কাউসার পারভীনের ক্যারিয়ার শেষ করে দিয়েছেন। মুসাররাত নাজির তো তার ভয়ে পাকিস্তান ছেড়ে কানাডা চলে গিয়েছিলেন।

কিংবদন্তী গায়িকা নূরজাহানের দুর্ব্যবহারের একটি কুখ্যাত ঘটনার লক্ষ্যবস্তু ছিলেন রুনা লায়লা। তখন রুনা লায়লা গান নবাগতা। তারের মত টানটান কণ্ঠ দিয়ে রুনা সবার হৃদয়ের দরোজায় টোকা মারছিলেন। একাত্তরের পর অভিনেত্রী শবনমের মত রুনাও পশ্চিম পাকিস্তানে সেটেল্ড হতে চেয়েছিলেন। একদিন নূরজাহান রেকর্ডিং রুমের কাছ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় সবাই তাকে মাত্রাতিরিক্ত সমাদর দেখাচ্ছিলো। যারা চেয়ারে বসা অবস্থায় ছিল নূরজাহানকে দেখামাত্র তটস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। কিন্তু রুনা লায়লা সেটা করেননি, হয়তবা তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি বুঝে উঠতে পারেননি। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন নূরজাহান। তিনি রুনার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তার দৃষ্টিতে এটা তার জন্য অপমানজনক ভেবে পাঞ্জাবী ভাষায় হাবিজাবি তিরস্কার করলেন রুনা লায়লাকে। রুনা তখন ইংরেজিতে জবাব দিয়েছিলেন এই বলে, “আমি বুঝতে পারছিনা সমস্যাটা কি?” আর তখনি নূরজাহান তরুণী রুনা লায়লাকে থাপ্পড় মেরে বসেন। এই দৃশ্য সচক্ষে দেখলো রেকর্ডিং ক্রু ও সঙ্গীতজ্ঞদের টিম। সেদিন কেউ এই ঘটনার প্রতিবাদ করেনি। হস্তক্ষেপ করার সাহসও পায়নি। কারণ নূরজাহানের সর্বাঙ্গে ছিল মিলিটারি শাসনের জোয়ার। রুনাকে চড় মেরেও তিনি শান্ত হননি। চেঁচিয়ে বললেন, “এখানে কি? চলে যাও তোমার মুল্লুকে।” সেদিনের ঘটনার আকস্মিকতায় স্তব্ধ হয়ে পড়েন রুনা লায়লা। স্টুডিও ছেড়ে হনহন করে বেরিয়ে যান তিনি। এরপর পাকিস্তান ছেড়ে চলে আসেন বাংলাদেশে। আমি মনে করি নূরজাহানের স্বৈরাচারী রোষানলে পড়বার কারণে আমরা একজন রুনা লায়লাকে পেয়েছি।

প্রসঙ্গত, রুনা লায়লাকে জীবনের চরম মুহূর্ত পার করতে হয়েছে শুধু বাঙ্গালী হওয়ার কারণে মন্তব্য করেন লেখিকা মিলি সুলতানা। চরম অপমানের শিকার হওয়ার পরও তিনি হাল ছাড়েনি যার জন্য শ্রেষ্ঠ কন্ঠশিল্পী হওয়ার মতো গৌরবের সুযোগ পেয়েছেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *